কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী – Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali

131
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী - Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী - Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী – Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী – Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali : ভারতীয় ধর্মীয় জীবনে গুরু রূপে পূজিত যে মহান তাপস তিনিই হলেন মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস (Maharshi Krishna Dvaipayana Veda Vyasa) ।

 শ্রাবণ পূর্ণিমা পূণ্যতিথিতে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস (Krishna Dvaipayana Veda Vyasa) জন্মগ্রহণ করেন । ঐ তিথি তাই গুরুপূর্ণিমা হিসাবে সারা ভারতে পালিত হয় ।

মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের জীবনী – Maharshi Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস (Krishna Dvaipayana Veda Vyasa) – এর বাবা ঋষি পরাশর বেদের অনেক মন্ত্র রচনা করেছিলেন । ব্যাসদেব ছিলেন বশিষ্ঠের প্রপৌত্র এবং শুকদেবের পিতা । এছাড়াও তিনি অনেক শাস্ত্রও রচনা করেছিলেন ।

 বদরিকাশ্রমেই বেদব্যাস বাস করতেন । বেদের বিভাগ – কর্তা হিসাবে তিনি খ্যাত । তাই তার নাম হয়েছিল বেদব্যাস । তার গায়ের রঙ ঘাের কৃষ্ণবর্ণ । একটি দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর নাম হয়েছিল কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন । 

 মহাভারতে বেদব্যাসের রূপ বর্ণনা অনুযায়ী তাকে ঋষীর মত মনে হয় না । পড়নে ব্যাঘ্রছাল । স্থূলকায় বিশালাকৃতির ব্যাসদেবের মাথায় ছিল কনকপিঙ্গল জটাভার । দেখলেই ভয় পাবার কথা । তাকে সকলেই মর্তের ব্রহ্মা – বিষ্ণু – মহেশ্বর বলেন ।

 ভাগবত , মহাভারত ইত্যাদি যত পুরাণ আছে সবই তিনি রচনা করেছিলেন । ঋক , সাম , যজু ও অথর্ব বেদের রচনাকারও তিনি ।

 মহাভারতের জন্মকাহিনী বর্ণিত আছে । সত্যবতী ছিলেন রাজা উপরিচর বসু ও অদ্রিকার কন্যা । তাঁর দেহ থেকে মাছের গন্ধ পাওয়া যেত বলে তার অন্য নাম ছিল মৎস্যগন্ধ্যা । কেউ তার ধারে কাছে যেত না । যমুনার তীরে এক দাস গৃহে তিনি লালিত – পালিত হয়েছিলেন । তার মত রূপ ধরাধামে আর ছিল না ।

 সত্যবতী যৌবনে পিতার আদেশে মুনিদের নদী পারাপারের কাজ করতেন । তাকে প্রতিদিনই গভীর বনের মধ্যে একাকী ঐ কাজ করতে হত । কেবলমাত্র ধর্ম – অর্থের বিনিময়ে ।

 এমনকি একদিন ঋষি পরাশর তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে ঐ নদীর কাছে এসে পরমাসুন্দরী সত্যবতীকে দেখেন । সত্যবতীর ঐ অপূর্ব রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন ।

 সত্যবতী ঋষি পরাশরের প্রস্তাবে খুশি হলেও গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েন । ঋষিকে তিনি মাছের গন্ধের কথা জানান ।

 সত্যবতী বলেন , আমাকে বিয়ে করলে স্পর্শ করবেন কেমন করে ? ঋযি সত্যবতীকে বর দিয়ে বললেন , তােমার দেহে আর ঐ মাছের গন্ধ থাকবে না । এবং মহারাজ তােমাকে বিয়ে করবেন । এবার থেকেপদ্মের সৌরভ তােমার গা থেকে পাওয়া যাবে ।

 ঋষির বরে এরপর থেকে সত্যবতীর দেহ থেকে অপূর্ব পদ্মের সৌরভ পাওয়া যেতে লাগল । তাই তার অন্য নাম হল পদ্মগন্ধা । এক যােজন দূর থেকে ঐ পদ্মগন্ধ পাওয়া যেত । তাই অনেকে তাকে যােজনগন্ধা নামেও অভিহিত করেন ।

 এরপরই ঋষি পরাশরের সঙ্গে কুমারী সত্যবতীর মিলন হয় । সেই সময়েই ঋষি পরাশরের সৃষ্ট যমুনা নদীর মাঝখানে এক দ্বীপে বেদব্যাসের জন্ম হয় ।

 জন্ম থেকেই তার মধ্যে তপস্যা ও বৈরাগ্যভাব দেখা যায় । শৈশব অবস্থাতেই তিনি পিতা ঋষি পরাশরের সঙ্গে তপস্যা করতে বেরিয়ে পড়েন । সত্যবতী স্বামী ও পুত্রের বিরহে কাতর হলে পুত্র ব্যাসদেব তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলেন , “ মা , তুমি যখনই আমাকে স্মরণ করবে , ঠিক তখনই আমি তােমার কাছে এসে হাজির হব । জননীর আজ্ঞা পেয়ে ব্যাসদেব তপস্যা করতে বনে চলে গেলেন ।

 এরপর হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনুর সঙ্গে সত্যবতীর বিয়ে হয় । চিত্রাঙ্গদা ও বিচিত্রবীর্য নামে সত্যবতীর দুই পুত্রের জন্ম হয় । দুর্ভাগ্যবশতঃ যৌবনেই ঐ দুই পুত্র ইহলােক ত্যাগ করেন ।

 গভীর চিন্তায় মগ্ন হন সত্যবতী । কে হবেন এরপর হস্তিনাপুরের রাজা ? এই নিয়ে তিনি বৃদ্ধ রাজা শান্তনু ও গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের সঙ্গে আলাপ আলােচনা করেন । তাদের পরামর্শমত কুমারী অবস্থায় থাকাকালীন যে পুত্রের জন্ম হয় অর্থাৎ ব্যাসদেবের স্মরণ নেন ।

 প্রতিজ্ঞামত ব্যাসদেব যথারীতি সত্যবতীর কাছে উপস্থিত হন ও সব কথা শােনেন । এরপর তৎকালীন ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসারে বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে দৈহিক মিলিত হয়ে তাদের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন ।

 যথারীতি অম্বিকার গর্ভে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডুবর্ণের পুত্র পাণ্ডুর জন্ম হয় ।

 এদিকে মা সত্যবতীর আদেশে এক ভক্তিপ্রাণা দাসীর গর্ভে ব্যাসদেব সন্তান উৎপাদন করেন । পরবর্তীকালে তিনিই হলেন সর্বস্থানের অধিকারী মহাজ্ঞানী বিদুর ।

 পরবর্তীকালে ব্যাসদেবের ঔরসজাত তিনপুত্র কৌরব বংশের উত্তরাধিকারী । বলা যায় , এরাই বলেন মহাভারতের তিন স্তম্ভ ।

 সরস্বতী নদীর তীরে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের আশ্রম ছিল । নির্জন এই স্থানে তিনি তপস্যা করতেন ।

 আশ্রমে একদিন তিনি দেখলেন , একটা চড়াই পাখি তার দুই ছানাকে পরম স্নেহে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে । এই দৃশ্য দেখে তার মনে স্নেহের উদ্রেক হয় ।

 একদিন দেবর্ষি নারদের সঙ্গে দেখা হতেই তাঁর এই স্নেহের কথা ব্যক্ত করেন এবং এর সমাধান জানতে চান ।

 এরপর তিনি অপ্সরা ঘৃতাচীকে বিয়ে করেন । ঘৃতাচীর গর্ভে শুকদেব নামে এক পুত্রের জন্ম হয় ।

 জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও হতশ্রী পাণ্ডুর জন্মের পরই ব্যাসদেব মহাভারতের বিশাল কাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে পড়েন । মহাভারতে বিভিন্ন সময়ে তার গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি নানাভাবে ঘটনাকে বিস্তৃত করেছে ।

 ব্যাসদেবের আশীর্বাদে গান্ধারীর শতপুত্রের জন্ম হয় । তাঁর পরামর্শেই গান্ধারী প্রসূত মাংসকে একশত একটি টুকরাে করে একশত পুত্র ও এক কন্যা সন্তান লাভ করেছিলেন ।

 পাণ্ডবদের সঙ্গে পাঞ্চালী দ্রৌপদীর বিয়ের সময় সম্পর্ক ঘনীভূত হয় । সেই সময় ব্যাসদেব উপস্থিত হয়েও যথাযথ পরামর্শ দিয়ে সঙ্কটমুক্ত করেন ।

 কৌরবদের সঙ্গে পাণ্ডবদের কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ নিশ্চিত হলে ব্যাসদেব একদিন ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় উপস্থিত হয়ে তাকে এই ধর্ম – অধর্মের যুদ্ধ নিজের চোখে দেখার জন্য দিব্যদৃষ্টি দান করতে চাইলেন । 

 কিন্তু পুত্রস্নেহে অন্ধ ও বাহ্যত দৃষ্টিহীন ধৃতরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষেই অধর্মকে বরণ করেন । এই উপলব্ধিবশতঃ ধর্মযুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে ধৃতরাষ্ট্র ভীত হন ও ব্যাসদেবের প্রস্তাব মত দিব্যদৃষ্টি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন ।

 এরপর ব্যাসদেব সারথী সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি দান করেন । সঞ্জয় সেই দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধক্ষেত্রের যাবতীয় বিবরণ জানান ।

 গান্ধারী সঞ্জয়ের বিবরণ থেকে জানতে পারেন যে তার শতপুত্রের মৃত্যু হয়েছে । স্বভাবতই প্রচণ্ড শােকাকুলা হয়ে তিনি পাণ্ডবদের অভিশাপ দিতে উদ্যত হন । সেইসময় ব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হয়ে এই মারাত্মক কাজ থেকে তাঁকে নিবৃত করেন ।

 এভাবেই দেখা যায় , মহাভারতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর সময় ব্যাসদেব সেখানে উপস্থিত হয়ে সুপরামর্শ দেন ।

 ব্যাসদেবের জীবনী আলােচনা করলে দেখা যায় , এ যেন নিজেরই সৃষ্টি করা এক জগতে বহুরূপে তাঁর নিজের জগৎ ও জীবনকে ভােগ করার এক দুঞ্জেয় লীলা ।

 করুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের পর সঞ্জয়ের অনুরােধে ঋষি ব্যাসদেব মহাভারতের সুবিশাল কাহিনী লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন ।

 কথিত আছে , মহাভারতের শ্লোকগুলি ব্যাসদেব রচনা করেছেন । মুখে মুখে এবং সিদ্ধিদাতা গণেশ সেই শ্লোকগুলি লেখেন । তিনি মােট ষাট লক্ষ শ্লোক রচনা করেছিলেন । তার মধ্যে ত্রিশ লক্ষ দেবলােক , পনের লক্ষ পিতৃলােক , চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলােক এবং বাকী সব মর্ত্যলােকে প্রচারিত হয় । এই লক্ষ শ্লোক বহু জ্ঞানী – গুণি পণ্ডিত জনেরা মূল সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করেন ।

 মহাভারতকে কেবলমাত্র ঐতিহাসিক কাহিনী হিসাবে বিচার করা উচিত নয় । কারণ , মহাভারতে বিস্তারিত ভাবে ভারতবর্ষের চিরায়ত ধর্ম , সাহিত্য , তপস্যা , দর্শন , রাজনীতি , সমাজনীতি , লােকাচার ইত্যাদি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন ।

 ব্যাসদেব মহাকাব্য মহাভারত ছাড়াও চারটি বেদ রচনা করেছিলেন । তাই মহাভারতকে বলা হয় পঞ্চম বেদ । এছাড়াও ব্যাসদেব বেদান্ত দর্শন রচনা ও করেছিলেন ।

আরোও পড়ুন –

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী – Rabindranath Tagore Biography in Bengali Click Here

আরোও পড়ুন –

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবনী – Bankim Chandra Chatterjee Biography in Bengali Click Here

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী – Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali 

      অসংখ্য ধন্যবাদ সময় করে আমাদের এই ” আদি কবি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস জীবনী – Krishna Dvaipayana Veda Vyasa Biography in Bengali  ” পােস্টটি পড়ার জন্য। এই ভাবেই BhugolShiksha.com ওয়েবসাইটের পাশে থাকো যেকোনো প্ৰশ্ন উত্তর জানতে এই ওয়েবসাইট টি ফলাে করো এবং নিজেকে  তথ্য সমৃদ্ধ করে তোলো , ধন্যবাদ।