পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতি | Regional geography of west bengal | Bhugol Shiksha

3863

বিষয়ঃ পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতির বিস্তারিত আলোচনা

পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতি : ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ভূমির গঠন অনুসারে পশ্চিমবঙ্গকে তিনটি ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলে ভাগ করা যায় , যথা – ( 1 ) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল , ( 2 ) পশ্চিমের উচ্চভূমি ও মালভূমি অঞ্চল ( 3 ) গঙ্গার বদ্বীপসহ সমভূমি অঞ্চল ।
( 1 ) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল :
অবস্থান : – পশ্চিমবঙ্গের উত্তরদিকে পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতমালাহিমালয়অবস্থান করছে । সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালার অংশ বিশেষ পর্বতময় এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর – পশ্চিম সিমান্তে পূর্ব হিমালয় পর্বতশ্রেণির উপর অবস্থিত । একমাত্র শিলিগুড়ি মহকুমা বাদে পুরাে দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলার উত্তর – পূর্বের সামান্য কিছু অংশ এই অঞ্চলের অন্তর্গত ।
ভূপ্রকৃতি : – এই পার্বত্যভূমি তরাই – এর সমভূমি থেকে ৩০০ মিটার সমােন্নতি রেখা বরাবর হঠা খাড়াভাবে উপরে উঠে গিয়েছে ( সমান উচ্চতাযুক্ত অঞ্চলকে যে রেখা দিয়ে যুক্ত করা হয় , তাকে সমান্নতি রেখা বলা হয় ) । প্রধানত পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা দিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটির ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বন্ধুর । এবড়াে – খেবড়াে পার্বত্যভূমি , পাহাড়ের খাঁড়া ঢাল , গভীর গিরিখাত এবং ছুরির ফলার মতাে পর্বতশিরা এই অঞ্চলের প্রধান ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য । হিমালয় পর্বতের কয়েকটি সিরিশ্রেণি এবং উপত্যকা নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকের ক্রমশ উচু হয়ে গেছে । তিস্তা নদী সিকিম থেকে এই অঞ্চলে প্রবেশ করে সুগভীর গিরিখাত দ্বারা এই অঞ্চলটিকে দুভাগে ভাগ করেছে , যেমন – ( ১ ) তিস্তার পশ্চিমদিকের পার্বত্য অঞ্চল এবং ( ২ ) তিস্তার পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চল । তিস্তার পশ্চিম দিকের পার্বত্য অঞ্চলটি পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চলের তুলনায় উঁচু ।

( ১ ) তিস্তা নদীর পশ্চিম দিকের পার্বত্য অঞ্চল : – তিস্তা নদীর পশ্চিম দিকের পার্বত্য অঞ্চলে দুইটি পর্বতশিরা দেখা যায় , এরা হলসিংগালীলাএবংদার্জিলিং মহালধিবামশৈলশিরা । সিংগালিলা শৈলশিরা নেপাল ও দার্জিলিং সিমান্তে অবস্থিত থেকে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলাকে নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে । সিংগালিলার চারটি উল্লেখযােগ্য পর্বতশৃঙ্গ হলফালুট , সান্দাকফু , টংলুওসবরগ্রাম । ফালুট পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৩ , ৫৯৫ মি . , সান্দাকফু পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৩ , ৬৩০ মি . , টংলু পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৩ , ০৩৬ মি . , ও সবরগ্রাম পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ৩ , ৫৪৩ মি . । সান্দাকফু পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম শৃঙ্গ । দার্জিলিং কাশিয়াং পর্বতমালার উল্লেখযােগ্য শৃঙ্গ হলটাইগার হিল । টাইগার হিলের উচ্চতা ২ , ৫৬৭মি . ।
( ২ ) তিস্তা নদীর পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চল : – তিস্তার পূর্বদিকে রয়েছেদুরবিনদারাপর্বত । এই পর্বতটি কালিম্পং শহর এর ঢালে অবস্থিত । কালিম্পং থেকে দুরবিনদারা পর্বতটি ক্রমশ নীচু হয়ে পূর্বদিকে জলঢাকা নদীর উপত্যকার দিকে এগিয়ে গেছে । এই অঞ্চলে দার্জিলিং হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গঋষিলাঅবস্থিত । ঋষিলা শৃঙ্গের উচ্চতা ৩ , ১৩০ মি . । ঋষিলা শূন্সের আরও পূর্বদিকে জলপাইগুড়ি জেলার উত্তর অংশে ডলােমাইট শিলায় গঠিত নাতিউচ্চ বস্কা – জয়ন্তী পাহাড় অবস্থিত । এই অঞ্চলটি অত্যাধিক বৃষ্টিপাতের ফলে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে পরিণত হয়েছে ।

( 2 ) পশ্চিমের উচ্চভূমি ও মালভূমি অঞ্চল :
অবস্থান : – পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম অংশে অবস্থিত এই ঢেউখেলানাে উচুভুমি ও মালভুমি অঞ্চলটি সমগ্র পুরুলিয়া জেলা এবং বাঁকুড়া , বীরভূম , বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমদিকের ৫০ মিটারের বেশি উচ্চতাযুক্ত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছে । গ্রানাইট ও নাইস শিলা দ্বারা গঠিত এই উচ্চভূমি অঞ্চলটি হল ছােটনাগপুর মালভূমির অংশ বিশেষ ।
ভূপ্রকৃতি : – সমগ্র উচ্চভূমি অঞ্চলটি দক্ষিণে বরাভুম উচ্চভূমি , পশ্চিমে পুরুলিয়া উচ্চভূমি এবং উত্তর – পূর্বে শুশুনিয়া উচ্চভূমিতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে । সুবর্ণরেখা , কংসাবতী , দ্বারকেশ্বর , কোপাই , অজয় , দামােদর প্রভৃতি নদীগুলির ক্ষয় কাজের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের এই উচ্চভূমি অঞ্চলটি । সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত এই উচ্চভূমির বাকি অংশগুলাে এখানে সেখানে টিলার মতাে ছােট ছােট পাহাড়ের আকারে পঁড়িয়ে আছে । এদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য পাহাড় হল পুরুলিয়া জেলারঅযােধ্যা , বাঘমুন্ডিওপাঞ্চে , বাঁকুড়া জেলারবিহারীনাথওশুশুনিয়া , বীরভূমেরমামাভাগ্নেপাহাড় প্রভৃতি । অযােধ্যা পাহাড়েরগােগরাবুরুপশ্চিমবঙ্গের মালভূমি অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । গােগবাবুরু শৃঙ্গের উচ্চতা ৬৭৭ মি . ।

( 3 ) গঙ্গার ব – দ্বীপসহ সমভূমি অঞ্চল :
ভূমিকা : – উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এবং পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলকে বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ স্থানই বৈচিত্র্যহীন সমভূমি । পশ্চিমবঙ্গের এই অঞ্চলটি নদীবাহিত পলি সঞ্চয়ের ফলে গড়ে উঠেছে । ভূপ্রকৃতি ও মৃত্তিকার পার্থক্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সমগ্র সমভূমি অঞ্চলকে ছয়ভাগে ভাগ করা যায় , যেমন – ( ১ ) তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চল , ( ২ ) উত্তরের সমভূমি অঞ্চল , ( ৩ ) রাঢ় অঞ্চল , ( ৪ ) উপকূলের বালুকাময় সমভূমি ( ৫ ) গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চল ও ( ৬ ) । সুন্দরবন অঞ্চল ।
( ১ ) তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চল : – পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের দক্ষিণে দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমা এবং জলপাইগুড়ি জেলার উত্তর ও পূর্বাংশে । পার্বত্য নদীবাহিত বালি ও নুড়ি জমে তরাই অঞ্চলটির সৃষ্টি হয়েছে । এই অঞ্চলটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢালু হয়ে গিয়েছে । অসংখ্য নদীখাত তরাই অঞ্চলটিকে বিভিন্ন সমান্তরাল অংশে বিভক্ত করেছে । এই অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে তিস্তা নদীর ডানদিকের অংশ তরাই এবং বাঁদিকের অংশ ডুয়ার্স । নামে পরিচিত ।
( ২ ) উত্তরের সমভূমি অঞ্চল : – পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের দক্ষিণে , তরাই ও গঙ্গার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত মালদহ , উত্তর – দিনাজপুর , দক্ষিণ দিনাজপুরএবং কোচবিহার – এই চারটি জেলা উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত । তিস্তা , তাের্সা , মহানন্দা প্রভৃতি নদীর পলি জমে এই অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে । মােটামুটিভাবে সমতল হলেও মাঝে মাঝে এখানে সেখানে খাল – বিল এবং উচু – নীচু জমি চোখে পড়ে । এখানে কোনও কোনও স্থানে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢিবি দেখা যায় । ভূপ্রকৃতিগত ভাবে উত্তরের সমভূমি অঞ্চলকেতাল , বরেন্দ্রভূমিওদিয়ারাএই তিনটি অংশে ভাগ করা যায় ।
( ৩ ) রাঢ় অঞ্চল : – পশ্চিমেরমালভূমির পূর্ব সিমা থেকে ভাগীরথী – হুগলী নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত , সামান্য ঢেউ খেলানাে ও পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঢালু হয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চলটি রাঢ় সমভূমি নামে পরিচিত । পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া , পশ্চিম মেদিনীপুর , বর্ধমান এবং বীরভূম জেলার পূর্বাংশ রাঢ় অঞ্চলের অন্তর্গত । পুরানাে পলিমাটি দিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটির মাটির রঙ লাল । অজয় , দামােদর , ময়ূরাক্ষী , শিলাবতী , কংসাবতী , বক্রেশ্বর প্রভৃতি হল রাঢ় অঞ্চলের প্রধান নদী । এই অঞ্চলটি কৃষিকাজে অত্যন্ত উন্নত ।
( ৪ ) উপকূলের বালুকাময় সমভূমি : – মেদিনীপুর জেলার উপকুল ভাগ এই অঞ্চলের অন্তর্গত । সর্বদক্ষিণের উপকূলবর্তী তটভূমি বালুকাময় । এখানকার তটভূমির ঢাল খুবই কম । এখানে বিভিন্ন স্থানে বালিয়াড়ি দেখা যায় । তটভূমির উত্তর দিকের বালিয়াড়িগুলি সমুদ্র উপকূলের সমান্তরালভাবে পূর্ব – পশ্চিমে বিস্তৃত । দুটি বালিয়াড়ির মাঝের নীচু অংশে জলাভূমি দেখা যায় ।
( ৫ ) গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চল : – এই বদ্বীপ অঞ্চলটি পূর্বদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে পশ্চিমে কান্দি মহকুমা বাদে সমগ্র মুর্শিদাবাদ , নদীয়া , হাওড়া , হুগলী , কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা এবং বর্ধমান ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পূর্বাংশের ৫০ মিটার সমােন্নতি রেখা বরাবর বিস্তৃত । এই অঞ্চলের । উত্তরে পদ্মা নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপস্থিত । সমগ্র অঞ্চলটি সমতল হলেও উত্তর থেকে দক্ষিণে ক্রমশ ঢালু হয়ে গিয়েছে । এই অঞ্চল পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপের একটি অংশ । গঙ্গা বা পদ্মা , ময়ূরাক্ষী , অজয় , দামােদর , দ্বারকেশ্বর , রূপনারায়ণ , কসাই প্রভৃতি নদনদী বাহিত পলি সঞ্চয়ের ফলে কালক্রমে সমুদ্রবক্ষ থেকে এই নতুন ভূভাগ বা বদ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে ।
( ৬ ) সুন্দরবন অঞ্চল : – দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণাংশ এই অঞ্চলের অন্তর্গত । এই অঞ্চলটি পুরােপুরিভাবে সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চলের অন্তর্গত , তাই এখানে বদ্বীপ গঠনের কাজ এখনােও চলছে । সুন্দরবনের নদীগর্ভ ছাড়া সমস্ত অংশই সমতল । সমুদ্রতল থেকে এই অঞ্চলের গড় উচ্চতা মাত্র ৩ – ৪ মিটার হওয়ায় এর অনেকটাই সমুদ্রজলের জোয়ারে ঢেকে যায় ।

বদ্বীপ অঞ্চলের শ্রেণি বিভাগ : গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় , যেমন – ( ১ ) মুমূর্ষ বদ্বীপ , ( ২ ) পরিণত বদ্বীপ ও ( ৩ ) সক্রিয় বদ্বীপ । ( ১ ) মুমূর্ষ বদ্বীপ : – নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলার এই বদ্বীপ অংশে নদীগুলাে গঙ্গা বা পদ্মা থেকে বিছিন্ন হয়ে মৃতপ্রায় হওয়ায় এই অঞ্চলের বদ্বীপ গঠন আর সম্ভব নয় । এখানে তাই প্রচুর বিল , জলাভূমি ও অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায় । ( ২ ) পরিণত বদ্বীপ : – ছােটনাগপুরের মালভূমি থেকে নদীবাহিত প্রচুর বালি , কঁকর , পলি প্রভৃতি জমে বর্ধমান , পূর্ব মেদিনীপুর , হাওড়া ও হুগলী জেলায় এই বদ্বীপ অঞ্চলের গঠন প্রায় শেষ হয়েছে । তাই এখানে জলাভূমির সংখ্যা অনেক কম এবং মৃত্তিকাও বেশ কঠিন । ( ৩ ) সক্রিয় বদ্বীপ : – উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং কলকাতা জেলার দক্ষিণে অবস্থিত সুন্দরবন অঞ্চলে নদী ও সমুদ্র বাহিত পলি দিয়ে বদ্বীপ গঠনের কাজ আজও চলছে । সমুদ্রের জোয়ারের প্রভাবে এখানকার মৃত্তিকা কিছুটা লবণাক্ত ।


সৌজন্যে – ভূগোল শিক্ষা
BhugolShiksha.com