পাত সংস্থান তত্ত্ব – Plate Tectonic Theory | Geo-Tactonics | Geography | BhugolShiksha.com

9230

পাত সংস্থান তত্ত্ব ( Plate Tectonic Theory)

ভূমিকা (Introduction): বর্তমানেযুগে পৃথিবীর ভূমিরূপ অর্থাৎ পর্বত, মালভূমি, মহাদেশ, সমুদ্র তলদেশের বিস্তৃতি, অগ্নুৎপাত প্রভৃতির গঠন সংক্রান্ত যে মতবাদ বিজ্ঞানী মহলে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো পাত সংস্থান তত্ত্ব। এই তথ্যটির বৈজ্ঞানিক সত্যতা থাকার জন্য বিজ্ঞানী মহলে এক আলোড়নের সৃষ্টি করে। এই তত্ত্বের প্রথম ব্যাখ্যা দেন মার্কিন বিজ্ঞানী উইলসন। এরপর 1967 সালের ম্যাকেঞ্জ ও পার্কার এবং 1968 সালে মরগ্যান নেই তত্ত্বের আরো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। ফরাসি বিজ্ঞানী পিচনকে আধুনিক পাত-গঠনিক তত্ত্বের প্রকৃত জনক বলা হয়। এছাড়াও অলিভার, সাইকস, হাইজলার প্রভৃতি বিজ্ঞানীদের নাম অতি প্রসিদ্ধ।

পাত সংস্থান তত্ত্বের মূল ধারণা ( Basic Concept of Plate Tectonic Theory ): পাত সংস্থান তত্ত্ব যে সূত্রটি উপর প্রতিষ্ঠিত তা হলো সমগ্র ভূ-ত্বক চ্যুতিরেখা বরাবর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন শিলাপাতের সমষ্টি বিশেষ। এক একটি অংশ ভূপৃষ্ঠ হতে 70 কিমি থেকে 50 কিমি এবং মহা সাগরের তলায় প্রায় 70 কিমি মত বিস্তৃত। ভূত্বকের এই গভীরতা স্থলভাগের তুলনায় জলভাগের তলদেশে অনেক কম হয়। এই সমস্ত শিলাপাত গুলি নিজস্ব উত্তপ্ত ও সান্দ্র গুরুমণ্ডলের উপর ভাসমান অবস্থায় স্থির রয়েছে। ভূগর্ভের তাপ ও চাপের তারতম্য এই পাতগুলি গতিশীল হয়ে পড়ে। পাতগুলি এক একটি শুধুমাত্র মহাদেশ ও মহাসমুদ্র অথবা অংশতমহাদেশও অংশত মহাসমুদ্র দিয়ে তৈরি হতে পারে।

ভূপৃষ্ঠের প্লেটের অবস্থান ( Location of Plate Boundary ): পৃথিবীর বিভিন্ন পাতগুলির অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন এবং তাদের মতে ভূপৃষ্ঠ সাতটি বড়, আটটি মাঝারি এবং কুড়িটি বেশি ক্ষুদ্র প্লেট রয়েছে। এই সকল বিভিন্ন আয়তনের পাতগুলির মধ্যে সাতটি বৃহৎ আকৃতির পাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
1 . প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত
2 . ইউরোপীয় পাত
3 . উত্তর আমেরিকা পাত
4 . দক্ষিণ আমেরিকা পাত
5 . অস্ট্রেলিয়া পাত
6 . আফ্রিকা পাত
7 . এন্টার্কটিকা পাত

   এই পদ গুলি আপাতভাবে স্থিতিশীল এবং ভূ আন্দোলনের প্রভাবমুক্ত তবে এদের প্রান্তভাগ গুলি সর্বদা গতিশীল এবং এই পাতগুলির প্রান্তসীমা নির্ধারণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভূমিকম্প কেন্দ্রের অবস্থানের সাহায্য নিয়েছেন। পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলি এবং প্রধান প্রধান আগ্নেয় বলয়গুলি পাতগুলির সীমানা বরাবর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত রয়েছে। পাতের সীমানা বরাবর অবস্থান করেছে সমস্ত ভূ-আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। এই ভূমিকম্প প্রবণ স্থানগুলিকে একটি রেখা দ্বারা যোগ করলেই পাতগুলোরসীমানা পাওয়া যায়।

বিভিন্ন প্রকার পাত সীমান্ত ( Different Types of Plate Boundary ):

    বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দারা বিজ্ঞানীরা পাতগুলির প্রান্তসীমানায় প্রধানত তিনটি গতি লক্ষ্য করেছেন।
[A] অভিসারী পাত সীমানা ( Converging Plate Boundary)
[B] প্রতিসারী পাত সীমানা ( Divergent Plate Boundary)
[C] প্রতিগামী পাত সীমানা ( Transfom Plate Boundary)

[A] অভিসারী পাত সীমানা ( Converging Plate Boundary ): দুই বিপরীত দিক হতে পরস্পর মুখোমুখি দুটি পাত যখন পরস্পরের দিকে গতিশীল হয় তখন তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে।

বৈশিষ্ট্য( Characteristics ): (i) পরস্পর অভিমুখে আগত পাত দুটির মধ্যে একটি যদি মহাসাগরীয় পাত হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মহাদেশীয় পাতের নিচে প্রবেশ করে।
(ii) মহাসাগরীয় বা মহাদেশীয় পাত পরস্পরের সংস্পর্শের জন্য পূর্ববর্তী ভূমিভাগের বিলুপ্তি হয়।
(iii) যে পাতটি বেঁকে ভূগর্ভস্থ Asthenosphere পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং উত্তপ্ত সান্দ্র পদার্থ প্রবেশ করে তার ঠিক উপরে অগ্ন্যুদগম ভূমিরূপ গড়ে তোলে।
(iv) দুটি পাতের মিলনের ফলে যে পাতটি বেঁকে অন্যপাতের নিচে অবস্থান করে সেই বক্রপাতযুক্ত ভূমিকম্প প্রবণ ঢালু প্লেটের সীমানাতলকে বেনীঅফ জোন বা Beneoff Zone বলে। এই বেনীঅফ জোন ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে 30 ডিগ্রি থেকে 80 ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে। তবে সাধারণত 45 ডিগ্রীর কাছাকাছি এই মন্ডল থাকে।

এই অভিসারী প্লেট সীমানাকে তিনটি প্রধানভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

1 . মহাদেশ – মহাদেশ অভিসারী প্লেট সীমান্ত: এক্ষেত্রে দুটি মহাদেশীয় পাত পরস্পর সম্মূখীন হয়ে থাকে। দুটি পাতের মধ্যে তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট পুরু পাত সংঘর্ষের ফলে স্বল্পপুরু পাতের নীচে ঢালিত হয়ে থাকে। ফলে মহাদেশ – মহাদেশ অভিসারী প্লেট সীমান্ত সৃষ্টি হয়।
উদ্ভুত ভূমিরূপ: ভঙ্গিলপর্বত মালা ও মহা অধ‌‌ভঙ্গ গঠন – সাধারণত দুটি মহাদেশীয় পাতের অবনমিত অঞ্চলে মহাঅধঃভঙ্গ গঠিত হয়। এখানে অগভীর সমুদ্র অবস্থান করে। এই সমুদ্রে হাজার হাজার ফুট পলিস্তর সঞ্চিত হয়। দুটি মহাদেশীয় পাত যখন পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয় তখন মধ্যবর্তী পলিস্তরে প্রচন্ড চাপ দেয় ফলে পলিস্তরে ভাঁজ পড়ে ও উথিত হয়। মধ্যের পলি রাশি ভাঁজ খেয়ে উপরে উঠার ফলে দুটি মহাদেশীয় পাত ভঙ্গিল পর্বতমালার দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত হয়। যে পাতটি যথেষ্ট পুরু তা স্বল্প পুরু পাতের নীচে চালিত হয়।

2 . মহাসমুদ্র – মহাদেশ অভিসারী পাত সীমানা: এই ধরনের সীমানা মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাতের সংযোগস্থলে পরস্পর আসা পথের সংযোগে হয়ে থাকে। এখানে মহাসাগরীয় প্লেট অপেক্ষাকৃত ভারী শিলা দ্বারা গঠিত বলে এটা মহাদেশীয় পাতের নিচে প্রবেশ করে। প্রকৃতপক্ষে দুটি পাতের মধ্যে মহাসাগরীয় পাতটি বেঁকে ভূগর্ভস্থ Asthenosphere এর উত্তপ্ত পদার্থের মধ্যে প্রবেশ করে এবং ঐ সকল লাভাজাত পদার্থের সঙ্গে মিশে যায়। দুটি পাতের মিলনস্থলে এক সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয়। যেখানে সামুদ্রিক পাত মহাদেশীয় পাতের নিচে নেমে যাচ্ছে তাকে অধঃপাত মন্ডল বা Subduction Zone বলে।
উদ্ভূত ভূমিরূপ: ভঙ্গিল পর্বতমালা – মহাসাগরীয় পাত প্রান্তে সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয়। সমুদ্রখাতে পলি সঞ্চিত হয়। পাতের চলন আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে সমুদ্র খাতে সঞ্চিত পলিরাশিতে ভাঁজ পড়ে ও ওই ভাঁজ বৃদ্ধি পেলে ভঙ্গিল পর্বতমালার সৃষ্টি হয়। এরই অনুগামী ঘটনা হিসেবে থাকে চ্যুতি ও ব‍্যাসল্ট এবং অ্যান্ডিসাইট জাতীয় লাভার নিঃসরণ হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতটি দক্ষিণ আমেরিকা পাতের নিচে চলে যাওয়ার ফলে আন্দিজ পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে।

3 . মহাসমুদ্র – মহাসমুদ্র অভিসারী পাত সীমান্ত: যখন দুটি মহা সামুদ্রিক প্লেট পরস্পর মুখী হয় তখন সংঘর্ষের ফলে একটি অপরটির নিচে নিমজ্জিত হয়। এর ফলে ওই অংশ থেকে লাভা প্রবাহিত হয়ে ভূপৃষ্ঠের উপরে বা নীচে সঞ্চিত হয়ে হয়ে আগ্নেয়দ্বীপশিলার উৎপত্তি ঘটে।
উদ্ভূত ভূমিরূপ: আগ্নেয় দ্বীপমালা – যদি দুটি মহাসাগরীয় পাত পরস্পরের সম্মুখীন হয় তাহলে সংস্পর্শের ফলে একটি অপরটির নিচে নিমজ্জিত হয় এবং নিমজ্জমান অংশ হতে লাভা প্রবাহিত হয়ে ভূপৃষ্ঠ উপরে বা নিচে সঞ্চিত হয়ে সৃষ্টি হয়ে আগ্নেয় দ্বীপ মালার সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ প্রশান্ত মহাসাগরের অ্যালুউশিয়াল দ্বীপপুঞ্জ এবং জাপান ও ফরমোসা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সৃষ্ট দ্বীপ মালা উল্লেখযোগ্য।
[B] প্রতিসারী পাত সীমানা ( Divergent Palte Boundary ): যখন দুটি পাত স্থানচ্যুত হয়ে পরস্পরের বিপরীত দিকে দূরে চলে যায় তখন তাকে প্রতিসারী পাত সীমানা বলে। বৈজ্ঞানিকগণ পাতের এইরূপ চলনের কারণ হিসেবে ভূ-অভ্যন্তরস্থ পরিচলন স্রোতের কথা উল্লেখ করেছেন।পরিচলন স্রোত উর্ধগামী হয়ে বিপরীত দিকে চলনে পাতকে বিপরীত দিকে চালিত করে।

উদ্ভূত ভূমিরূপ: ( a) শৈলসিরা – যখন দুটি সামুদ্রিক পাত স্থানচ্যুত হয়ে পরস্পরের দিকে সরে যেতে থাকে তখন তাদের সীমান্তে বিকর্ষণের চাপ অনেকাংশ হ্রাস পায়। ঐ সময় ভূ-গর্ভস্থ পদার্থ তরল পদার্থে পরিনত হয়। ঐ সকল তরল পদার্থ (লাভা) বাইরে এসে পাতসীমার শূন্যস্থানে সঞ্চিত হয়ে থাকে। এভাবে ক্রমাগত লাভা নিঃসরন হয়ে সমুদ্রগর্ভে বিস্তীর্ন অঞ্চল লাভা দ্বারা আবৃত করে দেয় ও সমুদ্রগর্ভে কঠিন তলদেশ গঠন করে। দীর্ঘ দিন পাত সীমানায় লাভা সঞ্চিত হলে তা উঁচু হয়ে মহাসাগরীয় শৈলশিরা গঠন করে। উদাহরণ – মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা।
( b ) গ্রস্থ উপত্যকা – পরিচলন স্রোত ঊর্ধ্বগামী হয়ে বিপরীতে দিকে চললে দুটি মহাদেশীয় পাতকে বিপরীত দিকে চালিত করে। এরপর দুটি মহাদেশীয় পাতের পরস্পর বিপরীত দিকে চলনের ফলে যে ফাটল বা চ্যুতি সৃষ্টি হয় তা দীর্ঘায়িত হয়ে গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরূপ আফ্রিকার পূর্ব-উপকূলস্থ উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত গ্রস্থ উপত্যকার কথা বলা যায়।

বৈশিষ্ট্য: (i) যেহেতু দুটি পাতের পরস্পরের বিপরীত মুখী গামী হয় বা চলন হয় তাই এর মধ্যবর্তী ভূমিভাগের কোনো বিকাশ হয় না। আর্থার হোমস এর মতে এই পরিস্থিতিকে Opening Thethis বলে।
(ii) মধ্যবর্তী চ্যুতি অংশে ক্রমশ ফাটল বৃদ্ধির জন্য অভ্যন্তরীণ লাভা বাইরে বেরিয়ে আসে এবং নতুন ভূমি সৃষ্টি করে যা মধ্য শৈলশিরা রূপে দেখতে পাই।
(iii) এই পাত সীমান্তকে গঠনকারী পাত সীমান্ত বলে কারণ এখানে মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা চ্যুতি উপত্যকা বা স্তূপ পর্বত গঠন হতে দেখা যায়।

[C] সংরক্ষনশীল বা প্রতিগামী পাত সীমান্ত ( Transform Plate Boundary ): অনেক সময় দুটি পাত পরস্পরের পাশাপাশি বিপরীত দিকে চলমান হয় তখন একে অপরের সঙ্গে বিনা সংঘর্ষে নিজেদের মধ্যে পাশাপাশি স্থান পরিবর্তন করে বিপরীত দিকে চলতে থাকে, এরকম পাত সীমানাকে সংরক্ষনশীল বা প্রতিগামী পাত সীমান্ত বা Transform Plate Boundary বলা হয়।
   এই পাত সীমায় প্রশমিত সক্রিয়তার ফলে কোন নতুন পাত সৃষ্টি হয় না আবার কোন পাতের বা ভূ-ত্বকের ধ্বংস হয় না। কারণ পাশ্ববর্তী পাতগুলি পরস্পর সংঘর্ষ ও বিপরিতমুখী না হওয়ার জন্য এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বৈশিষ্ট্য: (i) এই পাত সীমান্তে যেহেতু কোন সংঘাত বা দ্বিমুখী চলন হয় না তাই এখানে কোন ভূমির গঠন ও বিনাশ হয় না।
(ii) এই পাত সীমান্তে মধ্যম থেকে বৃহৎ এলাকা জুড়ে চ্যুতি রেখা লক্ষ্য করা যায়।
(iii) সংরক্ষনশীল পাত সীমান্তে পাতের আনুভূমিক সরনের জন্য পূর্বের গঠনকারী ভূমিরূপের আনুভূমিক স্থানচ্যুতি বিশাল আকার হয়ে থাকে।
(iv) এই পাত সীমান্তে প্রায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

সংরক্ষনশীল বা প্রতিগামী পাত সীমানাতে যে পরিস্থিতি গুলো গড়ে ওঠে তা হলো-
( a ) ভূমিকম্প প্রবন ও অগ্নুৎপাত হীন অবস্থা: এই ধরনের পাত সীমা কিছু শৈলশিরায় বা ফ্যাকচার অঞ্চল উপত্যকায় দেখা যায়। কেবলমাত্র Offsect শৈলশিরার মধ্যে সংকীর্ণ এলাকায় অগভীর ভূ-কম্পকেন্দ্রের অবস্থান ও অগ্নুৎপাতহীন পরিস্থিতি গড়ে তোলে।
( b ) চ্যুতি বিস্তার: সংরক্ষনশীল বা প্রতিগামী পাত সীমানাতে আনুভূমিক পাত চলনের ফলে বিশাল এলাকা ধরে ভূ-ত্বকের সংঘর্ষ ও অভিসারী অবস্থা না থাকার জন্য কোন অগ্নুৎগম হয় না শুধুমাত্র ঐ অঞ্চলে চ্যুতির বিস্তার ঘটে।

পাতের গতির কারণসমূহ ( Causes of Plate Movement ): পাতের গতির কারন সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। যথা-

( a ) পরিচলন স্রোত ( Connection Current ): ভূ-কম্পন যন্ত্রের মাধ্যমে ভূ-বিজ্ঞানীরা যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং তার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা হলো এই যে ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত অন্তস্থলে যে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয় সেই স্রোত ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত ওটা আছে। এই স্রোতের ফলে ভূ-গর্ভের তরল উষ্ণ পদার্থ সমূহ উপরে উঠে আসে এবং স্রোতের নিম্নগতির সাথে শীতল ও কঠিন শিলাস্তর নীচে নিমজ্জিত হয়। এই স্রোতের দ্বারা পাতের গতি নিয়ন্ত্রিত হয়।

( b ) ঠেলা পদ্ধতি ( Pushing Mechanism ): এই পদ্ধতিতে পাত সীমানার নিচে উষ্ণ গলিত পদার্থসমূহের চাপের বৃদ্ধি ঘটলে তা উপরিস্থিত পাত সীমানায় প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে। এরূপ চাপের ফলে পাত সীমানার উভয় পাশে বাইরের দিকে চাপের বৃদ্ধি ঘটে এবং পাতগুলি বিপরীতমুখী চলনের সৃষ্টি করে।

( c ) আকর্ষণ পদ্ধতি ( Pulling Mechanism ):এই পদ্ধতিতে দুটি পাত ভূমিকম্পের প্রভাবে পরস্পরের নিকটবর্তী হলে একটি অপরটির তলদেশে নির্বাচিত হয়। এর ফলে পার্শ্ববর্তী পাতগুলিও সীমানার দিকে আকর্ষিত হয় এবং চলনের সৃষ্টি হয়।

সমালোচনা ( Criticism ):
A) পক্ষে যুক্তি- (i) প্লেট ভূ-গঠন মতবাদে যে পাতের চলন এর ধারণা দেওয়া হয়েছে সে ধারণা ঠিক বলা যেতে পারে কারণ ভূ-ত্বকের অভ্যন্তরে এখনও গলিত ম‍্যাগমার অবস্থান রয়েছে।
(ii) এই মতবাদ থেকে ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ ভূমিরূপ গঠনের বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে।
(iii) এই মতবাদ কোনো একটি ব্যাক্তির মতবাদ নয়। সম্মিলিত ভূ-বিজ্ঞানীগন মিলে বিজ্ঞান সম্মতভাবে এই মতবাদ গড়ে তুলেছেন।
(iv) পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগরের গঠন এবং তার অভ্যন্তরীন ভূ-ভাগ গঠন সম্পর্কে ধারণাতে এই মতবাদ সর্বাধুনিক।

B) বিপক্ষে যুক্তি- (i) Asthenosphere এর মধ্যে পরিচলন স্রোতের কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় অর্থাত পরিচলন স্রোত সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক।
(ii) ভূতকের বিশাল পাত চলনের সঠিক কারন কিন্তু এই মতবাদে বলা হয়নি।
(iii) এই মতবাদে কিছু পর্বতের সৃষ্টির ব্যাখ্যাদিতে পারলেও কিছু পর্বত যেমন অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব অঞ্চলের পার্বত্য ভূমির গঠন সম্পর্কে ধারণা এই মতবাদ দিতে পারেনি।
(iv) জর্ডানের মতে শিলামণ্ডলের ভূমি ভূ-ভাগের নীচে Asthenosphere এর সাগর তলের তুলনায় অনেক বেশী গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত যা প্লেট মতবাদের বিরোধী ধারণা।

       সবশেষে বলা যায়, এই ধারণা অত্যাধুনিক হওয়ায় এর গুরুত্ব এখনও রয়েছে।


– দেবব্রত মন্ডল
© ভূগোল শিক্ষা


নিচের শেয়ার বাটনে ক্লিক করেন শেয়ার করাে বন্ধুদের মাঝে